অনলাইন ডেস্ক ১ এপ্রিল ২০২৪ , ১:৩১:১৪
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। সোমবার (০১ এপ্রিল) বুয়েটের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ নেতা ইমতিয়াজ রাব্বি এ রিট দায়ের করেন। রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার হারুনুর রশিদ বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন।
রিটে নিয়মতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতি চালুর নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। দুপুর একটার পর এ বিষয়ে শুনানির কথা রয়েছে। বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ নিহত হওয়ার ঘটনায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ২০১৯ সালের ১১ অক্টোবর বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে প্রশাসন।
মূলত গত কয়েক দিন ধরে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক চলছে। ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি মুক্ত রাখার দাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে ছাত্ররাজনীতি চালুর দাবিতে ২৪ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে ছাত্রলীগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বলছে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা চাইলে চালু হতে পারে ছাত্র রাজনীতি।
গতকাল ৩১ মার্চ রোববার ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের ইস্যুতে আবারও উত্তাল হয়ে উঠে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। ছয় দফা দাবিতে আন্দোলন করেন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। অপরদিকে ছাত্র রাজনীতি ফেরানোর দাবিতে কর্মসূচি পালন করেছে ছাত্রলীগ।
মধ্যরাতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রবেশের ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ হোসেন রহিমের হলের সিট বাতিল করে প্রশাসন। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এর সঙ্গে আরও পাঁচটি দাবি উত্থাপন করেছেন তারা। অপরদিকে বুয়েট ক্যাম্পাসে চার বছর ধরে নিষিদ্ধ থাকা ছাত্ররাজনীতি ফিরিয়ে আনার দাবিতে সরব হয়েছে ছাত্রলীগ।
শনিবার (৩০ মার্চ) লিখিত বক্তব্যে আন্দোলনকারীরা জানান, আমরা বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা গত ২৮ মার্চ মধ্যরাতে ক্যাম্পাসে বহিরাগত অনুপ্রবেশে নিরাপত্তার অভাব বোধ করছি। এই মর্মে বুয়েট ক্যাম্পাসকে নিরাপদ করার লক্ষ্যে বুয়েট প্রশাসনের নিকট নিম্নোক্ত দাবিগুলো গতকাল (শুক্রবার) পেশ করেছিলাম।
শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো হলো-
১. মধ্যরাতে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সমাগমের মূল সংগঠক ইমতিয়াজ রাব্বি ‘বুয়েটে সব রকম রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ এই নীতিমালা ভঙ্গ করায় ইমতিয়াজ রাব্বির বুয়েট থেকে স্থায়ী বহিষ্কার এবং হলের সিট বাতিলের দাবি। প্রশাসন ইমতিয়াজ রাব্বির হলের সিট বাতিল করলেও বুয়েট থেকে তাকে স্থায়ী অ্যাকাডেমিক বহিষ্কার করেনি। আন্দোলনকারীরা ইমতিয়াজ রাব্বির স্থায়ী অ্যাকাডেমিক বহিষ্কারের দাবি জানান।
২. উক্ত ঘটনায় ইমতিয়াজ রাব্বির সঙ্গে বুয়েটের বাকি যেসব শিক্ষার্থী জড়িত তাদের মধ্যে এ এস এম আনাস ফেরদৌস (আইডি: ১৮১৮০০৪), মোহাম্মদ হাসিন আরমান নিহাল (আইডি: ২১০৬১০১), অনিরুদ্ধ মজুমদার (আইডি: ২১০৬০৭৯), জাহিরুল ইসলাম ইমন (আইডি: ২১১২০৩১) এবং সায়েম মাহমুদ সাজেদিন রিফাতকে (আইডি: ২১০৬১২৬) বুয়েট ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক অপশক্তি অনুপ্রবেশ করানোর চেষ্টা করায় স্থায়ী অ্যাকাডেমিক এবং হল বহিষ্কারের দাবি জানান তারা। এদের বাইরে বাকি আরও যারা জড়িত ছিল তাদের শনাক্ত করে সবাইকেই উল্লিখিত অভিযুক্তদের মতোই একই মেয়াদে শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
৩. ক্যাম্পাসে প্রবেশ করা বহিরাগত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না, তারা কেন, কীভাবে প্রবেশ করার অনুমতি পেলো এই ব্যাপারে সুস্পষ্ট সদুত্তর এবং জবাবদিহিতা চেয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। তার পরিপ্রেক্ষিতে বুয়েট উপাচার্য ব্যবস্থা নেয়ার মৌখিক আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান তারা। দাবিটির বিষয়ে বুয়েট প্রশাসনের কাছ থেকে লিখিত নোটিশ এবং বাস্তবায়নের দাবি আন্দোলনকারীদের।
8. শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য ‘রাত সাড়ে ১০টার পর সব ছাত্রছাত্রীর ক্যাম্পাসে থাকা নিষেধ’ এবং যেকোনো প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের রাত সাড়ে ১০টার পরও ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিদফতরের পরিচালকের (ডিএসডব্লিউ) অনুমতির প্রয়োজন পড়ে। ডিএসডব্লিউর প্রটোকল ভেঙে বহিরাগতরা মধ্যরাতে সেমিনার রুমে মিটিং করতে সক্ষম হয়েছে। নিজের প্রটোকল অব্যাহত রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় অথবা ‘বুয়েটে সব প্রকার রাজনৈতিক সংগঠন এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ ইহার লঙ্ঘন করায় ডিএসডব্লিউর দ্রুততম সময়ের মধ্যে পদত্যাগ দাবি করেন তারা।
৫. ক্যাম্পাসে মধ্যরাতে বহিরাগতদের প্রবেশের কারণে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা জানিয়ে এর প্রতিবাদ হিসেবে ৩০ মার্চের টার্ম ফাইনাল বর্জন এবং ৩১ মার্চের টার্ম ফাইনালসহ সব অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বর্জন।
৬. আন্দোলনরত বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনোরকম হয়রানিমূলক ব্যবস্থা নেয়া যাবে না এই মর্মে লিখিত প্রতিশ্রুতি দাবি।
এদিকে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক, মৌলিক অধিকার পরিপন্থি ও শিক্ষাবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছে ছাত্রলীগ। এই ইস্যুতে রোববার (৩১ মার্চ) দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতিবাদ সমাবেশের পর নেতাকর্মীদের নিয়ে বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
তবে এ সময় সেখানে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ইমতিয়াজ রাব্বি ছাড়া বুয়েটের কোনো শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন না। পরে দুপুর আড়াইটার দিকে নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে বুয়েট শহীদ মিনার সংলগ্ন বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীরা।
এর আগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক সমাবেশে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি ফেরানোর আলটিমেটাম দেন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন। তিনি বলেন, বুয়েট প্রশাসনের কাছে আমাদের আহ্বান থাকবে, অনতিবিলম্বে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি চালু করতে হবে। যে নিয়ম আপনারা শুরু করেছেন সেটি কালাকানুন, সেটি কালো আইন।
এ সময় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ইমতিয়াজ রাব্বির বৈধ সিট ফিরিয়ে দেয়ারও আহ্বান জানান তারা।
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে, বুয়েটের শের-ই-বাংলা হলে পিটিয়ে হত্যা করা হয় শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে। বারবার প্রাণ বাঁচানোর আকুতি জানালেও বাঁচতে পারেননি তিনি। ৬ ঘণ্টা নির্যাতনের পর মারা গেলে হলের দোতলা ও নিচতলার মাঝামাঝি সিঁড়িতে ফেলে রাখা হয় আবরারের মরদেহ। সিসিটিভির ফুটেজে ধরা পড়ে সেই দৃশ্য। শনাক্ত করা হয় আসামিদের। এদের বেশিরভাগই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এই ঘটনার পর ২০১৯ সালের ১৬ নভেম্বর শিক্ষার্থীদের রাজনীতিতে অংশ না নিতে প্রজ্ঞাপন জারি করে বুয়েট প্রশাসন।