অনলাইন ডেস্ক ২০ আগস্ট ২০২৪ , ১১:১৩:৫০
স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় ভালো ফল করেছিলেন নূপুর আক্তার। তাই তাকে একটা সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলেন ভাই মো. সোহেল। মাকে বলেছিলেন, বোনকে যেন তা না জানায়।
“কিন্তু ভাইয়া যে আমাকে এভাবে সারপ্রাইজ দিয়ে চলে যাবে, তা ভাবতেও পারিনি। এটা আমি কেমনে সইবো!” কান্নার দমকে আর কথা বলতে পারলেন না নূপুর।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন সহিংসতায় গড়ালে গত ১৯ জুলাই গুলশান বাড্ডা লিংক রোডের গুদারাঘাটের সামনে পায়ে গুলিবিদ্ধ হন সোহেল। সেদিন ছিল শুক্রবার। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে পরের শুক্রবার ২৬ জুলাই মৃত্যু হয় তার।
সোহেলের মৃত্যুর পর প্রায় এক মাস গড়িয়ে গেছে, সেই আন্দোলনে সরকারেরও পতন ঘটেছে। এখনও হারিয়ে যাওয়া ভাইয়ের স্মৃতি মনে করে কেঁদে উঠেন বোন, মুর্ছা যান মা রহিমা বেগম।
ঢাকার উত্তর বাড্ডার স্বাধীনতা সরণীর রাসুলবাগ এলাকায় সোহেলের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় সোহেলের স্বজনদের সঙ্গে। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ মা এখন সবখানে হাতড়ে বেড়ান ছেলের স্মৃতি।
সেই শুক্রবারের মুহূর্তগুলো তুলে ধরে রহিমা বেগম বলেন, “ছেলে আমাকে বললো, মা আমি নামাজ পড়তে যাই। আমার জন্য পোলাও রোস্ট রাইখো।” মা তখন শুধু বলেছিলেন, “যাও, নামাজ পড়ে দ্রুত আইসো।”
এরপর মায়ের শুধু অপেক্ষা, ছেলে তো আর বাসায় ফেরে না। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে বাড়িতে খবর আসে সোহেলের গায়ে গুলি লেগেছে। শুনেই দ্রুত মেয়েকে নিয়ে বাড্ডার এ এম জেড হাসপাতালে যান রহিমা।
“যাইয়া দেখি জরুরি বিভাগে পা ব্যান্ডেজ করে আমার মানিকরে রাখছে। ডাক্তাররা কইলো, মনে হয় পায়ের রগ ছিঁড়ে গেছে, পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যান। রাস্তায় কোনও গাড়ি পাই না। একটা রিকশায় উঠাইয়া রওনা দেই। গুলশান যাওয়ার পর একটা সিএনজি করে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যাই।”
সেদিনই রাতে অস্ত্রোপচার হয় সোহেলের পায়ে। দু-একদিনের মধ্যেই বাসায় ফিরতে পারবে, এমন আশা দিয়েছিলেন চিকিৎসকরাও। কিন্তু জ্ঞান ফেরার পর যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকেন সোহেল। দুই দিন পর সোহেলের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়ে। তখন তাকে রাখা হয় আইসিইউতে।
এক নজর দেখা বা একবার কথা বলার জন্য দরজার পাশে বসে থাকা মায়ের দোয়া আর বোনের আকুল ভালোবাসাও তাকে ফেরাতে পারেনি আইসিইউ থেকে।
সোহেলের বাবা জাহাঙ্গীর আলম পিকআপভ্যান চালান। বয়স হওয়ায় একদিন কাজ পেলে আরেক দিন পান না। তাই সংসার নিয়ে বেশি ভাবনা ছিল সোহেলেরই।
অশ্রুচোখে রহিমা বলেন, “এই ছেলেই ছিল আমার পরিবারের হাল ধরার একমাত্র অবলম্বন। লেখাপড়ার পাশাপাশি সংসার নিয়ে তার অনেক চিন্তা ছিল। বোনকে নিয়ে ওর অনেক স্বপ্ন ছিল। যতক্ষণ বোন পড়ত, পাশে বসে থাকত। আমাকে বলে, মা নূপুরকে বলবা না। আমি ওরে একটা সুন্দর ড্রেস উপহার দিব।”
উচ্চমাধ্যমিক পাস করে অনেক দিন পড়াশোনা করতে পারেননি সোহেল। পরে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রিতে ভর্তি হয়ে নতুন উদ্যমে শুরু করেন লেখাপড়া। তবে নিজের থেকে বেশি চেয়েছিলেন বোনকে প্রতিষ্ঠিত করতে। সেই বোনের কাছে ভাই এখন শুধুই স্মৃতি।
নূপুর বলেন, “গুলি খেয়ে বিছানায় শুয়েও জানতে চাইত, আম্মু রাগ করেছে কি না? আমি বলছি- না, কেউ রাগ করে নাই। শেষ সময়ে বাবার কাছেও ক্ষমা চেয়েছে।”
ছেলে মিছিলে যাবে, তা বুঝতে পারেননি রহিমা; বলেন, “আমি জানলে ওরে ওইদিন যাইতে দিতাম না।”
সন্তানহারা এই মায়ের এখন শুধু চাওয়া ছেলে হত্যার বিচার।
“আন্দোলনে যারা মারা গেছে, তাদের হত্যাকারীদের যেভাবে বিচার হবে, আমার ছেলের হত্যাকারীর বিচারও যেন সেভাবে হয়।”